তারেক জিয়া সরকার এখন দেশ পরিচালনা করছেন। ইতোমধ্যে ২৫ মে সরকারের ১০০ দিন পূর্তি হয়েছে। অর্থাৎ ১০০ দিন শেষ হয়েছে। স্মরণ করা দরকার, চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি এই সরকার শপথ গ্রহণের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করে। ২৫ মে ছিল ১০০ দিন পূর্তি দিবস।
সরকারের ১০০ দিন পূর্তি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনের ব্যবস্থা করা হয়।
সরকারের উচ্চ বর্গের কর্তারা মোটামুটি ওই সম্মেলনে হাজির থেকে জানান, ‘লুণ্ঠিত অধিকার ফেরাচ্ছে সরকার।’
প্রধানমন্ত্রীর একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী ও জনবান্ধব নেতৃত্বে দেশ আজ গভীর শঙ্কট কাটিয়ে জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিতের পথে এগিয়ে চলেছে। সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম ১০০ দিনেই লুণ্ঠিত রাষ্ট্রীয় মালিকানা জনগণের কাছে আবার ফিরিয়ে দিয়েছে। মজবুতভাবে এগিয়ে চলেছে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো।”
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র, ওই উপদেষ্টা বলেন, “চলতি বছরের গত ১৭ ফেব্রুয়ারি এ সরকার শপথ গ্রহণের পর প্রথম দিন থেকেই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি ভিআইপি সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে জনসম্পৃক্ততাকে এক নতুন উচ্চতায় দাঁড় করিয়েছেন।”
ওই সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “আগে ভুক্তভোগীরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার জন্য গণভবনের সামনে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতেন। কিন্তু এখন দর্শনার্থী বা ভুক্তভোগীরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে যান না, বরং প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়াই মুহূর্তে জনগণের দুয়ারে পৌঁছে যাচ্ছেন।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে উন্মুক্ত প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নেওয়া কিংবা পথে বাস থামিয়ে শিশুদের আবদার পূরণ করা, এসবই তার মানবিক ও জনমুখী রাজনীতির অনন্য দৃষ্টান্ত। এভাবে মাহদী আমিন নামক ওই উপদেষ্টা সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের একশ’ দিনের বিশাল ফিরিস্তি তুলে ধরেন।
অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও পাচার হওয়া অর্থ ফেরত প্রসঙ্গ : প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, “দেশের মানুষের প্রকৃত অধিকার ফিরিয়ে দিতে এবং দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিতে সরকার দ্রুতভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বহুল আলোচিত এস আলম গ্রুপের চার হাজার ২৬৪ কোটি টাকার স্থাবর সম্পদ-সম্পত্তি সফলভাবে জব্দ করা হয়েছে। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে দশটি দেশের মধ্যে তিনটি দেশের সঙ্গে ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এছাড়া ক্ষমতাচ্যুত হাসিনার ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে বাদ দেওয়া ‘ইসরাইল ব্যতীত’ শব্দবন্ধ, জাতীয় স্বার্থ ও মূল্যবোধের প্রতি সম্মান জানিয়ে পুনরায় বাংলাদেশি পাসপোর্টে যুক্ত করা হচ্ছে। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করেছে বর্তমান সরকার।”
কৃষি, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা : সরকারের প্রথম ১০০ দিনের অর্জনের চিত্র তুলে ধরে উপদেষ্টা মাহদী হাসান বলেন, “সরকার দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম মাসেই ‘নারী কেন্দ্রিক ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হয়েছে। ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ সুদ সহ মওকুফ করা হয়েছে। মা- বোনদের রান্নার কষ্ট লাঘবে বিশেষ ভর্তুকি সহ যুগান্তকারী ‘এলপিজি কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”
ওই সংবাদ সম্মেলনে লম্বা ফিরিস্থিতিতে তিনি আরও জানান, “শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক খাল খনন কর্মসূচির পুনরুজ্জীবন ঘটানো হয়েছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে দেশ জুড়ে অ্যামপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ চালু এবং প্রায় দুই লাখ ফ্রিল্যান্সারকে রাষ্ট্রীয় পরিচয় পত্র দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”
প্রযুক্তি মেগাসিটি ও আধুনিক অবকাঠামো : দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে চলমান সরকার। মহানগরী ঢাকাকে দূষণমুক্ত করতে ‘গ্রিন এন্ড ক্লিন ঢাকা’ মহা পরিকল্পনার আওতায় ২৫০টি ইলেকট্রিক বাস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আগামী ১৬ ডিসেম্বর এর মধ্যে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল উদ্বোধনের লক্ষ্য নিয়ে উন্নয়ন কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও আইনের শাসন : ২০২৪ এ ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানের শহিদদের আত্মত্যাগ স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, আন্দোলনে অংশ নেওয়া মৃত্যুঞ্জয়ী বীরদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে জাতীয় সংসদে ‘জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি আইন’ পাস করা হয়েছে। জুলাই আন্দোলনের শতাধিক আহত যোদ্ধাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাশিয়া ও সিঙ্গাপুর পাঠানো হয়েছে।
বিচার হীনতার সংস্কৃতি ভাঙার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “মেহেরপুরে নয় বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের দায়ে মাত্র ২৯ কার্য দিবসের মধ্যে আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় দেশের বিচার ব্যবস্থায় এক বিরল নজির!
সংসদীয় গণতন্ত্রের নতুন রূপ : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সদ্য সমাপ্ত প্রথম অধিবেশন প্রসঙ্গে উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, “এই সংসদে অত্যন্ত স্বল্প সময়ে রেকর্ডসংখ্যক মোট ৯৪টি বিল পাস হয়েছে। ফ্লোর ক্রসিং না করে সাধারণ আসনের তৃতীয় সারিতে বসে প্রধানমন্ত্রী সংসদীয় রীতিনিতির প্রতি যে বিরল সম্মান প্রদর্শন করেছেন, সবাইকে বিমোহিত করেছে।” প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্ধৃতি দিয়ে উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, “করবো কাজ গড়বো দেশ সবার আগে বাংলাদেশ।” দল-মত নির্বিশেষে বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষের চল্লিশ কোটি হাত কাজে লাগিয়ে একটি মর্যাদাশীল ও স্বনির্ভর রাষ্ট্র গঠনে বর্তমান সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ।”
উপদেষ্টা আরও বলেন, “প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে বিষয়ভিত্তিক ও খাত নির্ভর ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের জরুরি নির্দেশনা দেন, যার ফলে পুরো রাষ্ট্র কাঠামো একযোগে লক্ষ্য স্থির করে নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে অনিঃশেষ কাজ করে যাচ্ছে। কালের অভূতপূর্ব এই কর্মযজ্ঞে সাধারণ মানুষের জীবনমান-এ ইতোমধ্যেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। গুম খুন হামলা মামলা এবং দমন পীড়নের দীর্ঘপথ অতিক্রম করে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের মন্ত্রিসভা ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৪ মে পর্যন্ত মোট ১০টি ক্যাবিনেট সভা সম্পন্ন করেছে। এসব সময় সর্বসম্মতিক্রমে ৬০টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭টি সিদ্ধান্ত অর্থাৎ প্রায় ৬২ শতাংশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে এবং অবশিষ্ট ২৩টি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় রয়েছে। তাছাড়া গত মাসে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছে, তাও এই গণতান্ত্রিক সরকারের প্রতি প্রবাসী বাংলাদেশিদের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতিফলন।”
একই সঙ্গে সরকারের বিশেষ উদ্যোগে এবার সাধারণ হজ যাত্রীদের বিমানভাড়া ব্যাপকভাবে কমানো সম্ভব হয়েছে। উপদেষ্টা আরও বলেন, “শিশু রামিশার সঙ্গে এক ভয়াবহ ও নৃশংস অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইন মন্ত্রীসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ তাদের বাসায় গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে চার্জশিট দাখিল হয়েছে।”
বাক্ স্বাধীনতা নিশ্চিত কাজ করছে সরকার : সরকার দেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীন বিকাশ নিশ্চিত করতে কাজ করছে। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে কীভাবে মানুষের বাক্ স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছিল এবং গণমাধ্যমকে বল প্রয়োগের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছিল, তা সমগ্র জাতি দেখেছে। এর বিপরীতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন প্রতিটি বিএনপি সরকারই দেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীন বিকাশ নিশ্চিত করেছে। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারও গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের সর্বোচ্চ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু এই নজির বিহীন স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে একটি গোষ্ঠী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নৈরাজ্য সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে এবং বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচারে লিপ্ত রয়েছে।
এমনকি প্রধানমন্ত্রী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ কে নিয়ে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা অশোভন আচরণ অশ্লীল কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সামাজিক অস্থিতিশীলতা তৈরির যে নগ্ন প্রয়াস চলছে, তা গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার জন্য ক্ষতিকর। বাক্ স্বাধীনতার নামে অপপ্রচার, বিদ্বেষ বা বিষোদগার এর যে রাজনীতি একটি গোষ্ঠীর অপকৌশলে পরিণত হয়েছে, সেই চর্চা গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এ প্রসঙ্গে উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, “প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য বিকৃত করে ছাপানো হয়েছে, এবং একটি টেলিভিশনের কিশোরী প্রতিবেদক এর প্রধানমন্ত্রীর প্রতি তাচ্ছিল্যের বিষয় উল্লেখ করে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং এহেনও কর্মকাণ্ডকে তিনি বাক্ স্বাধীনতার নামে রীতিমতো অপরাধের শামিল বলে উল্লেখ করেন। ঈদের বর্জ্য নিষ্কাশনকেও সরকারের সাফল্য বলে তুলে ধরেছেন।”
আমরা সরকারের ১০০ দিনের অগ্রগতি সম্পর্কে সরকারি ভাষ্য যা পেলাম তা রাষ্ট্রের জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমাদের বক্তব্য আইনশৃঙ্খলার পর্যায়ক্রমে উন্নতি এবং বাজার ব্যবস্থা মনিটরিং এর মাধ্যমে স্থিতিশীল রাখার ব্যাপারে সাধারণ মানুষ সরকারের কর্মকাণ্ডের দিকে তাকিয়ে আছে। কারণ ইতোমধ্যে তেল গ্যাস এবং বেশ কিছু নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। বাজেট ঘোষণার পর এগুলি আয়ত্তে না রাখতে পারলে, পরে সরকারের পক্ষে সামাল দেওয়া কঠিন হবে বলে আমরা মনে করি।”
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
খুলনা গেজেট/এনএম

